
চট্টগ্রাম (পটিয়া) প্রতিনিধি:
মোঃসাকিল
দীর্ঘ প্রতীক্ষা ও উৎকণ্ঠার অবসান ঘটিয়ে অত্যন্ত আনন্দঘন ও উৎসবমুখর পরিবেশে সম্পন্ন হলো চলতি বছরের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষা। আর এই পুরো পরীক্ষাকালীন সময়ে চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার উত্তর ছনহরা এলাকার পরীক্ষার্থীদের জন্য এক অনন্য ও পদাঙ্ক অনুসরণীয় মানবিকতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করে দেখালো একদল স্বপ্নবাজ তরুণ।
পরীক্ষার প্রথম দিন থেকে শুরু করে আজ ১৭ মে (রবিবার) শেষ দিন পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের নিরাপদ যাতায়াত এবং উন্নত মানের খাবারের নিশ্চয়তা দিতে পরিচালিত ‘ফ্রি গাড়ি ও খাবার সার্ভিস’ আজ সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গাউছিয়া কমিটি বাংলাদেশ (উত্তর ছনহরা শাখা) ও তাহেরীয়া ফাউন্ডেশনের যৌথ ব্যবস্থাপনায় এবং সৌদি আরব প্রবাসী বিশিষ্ট সমাজসেবক ও শিক্ষানুরাগী জাকারিয়া কবিরের সার্বিক অর্থায়ন ও সহযোগিতায় এই ব্যতিক্রমী সেবা কার্যক্রমটি পরিচালিত হয়।
পরীক্ষা শুরুর দিন থেকে প্রতিদিন সকাল হতেই স্বেচ্ছাসেবকরা পরীক্ষার্থীদের কেন্দ্রে পৌঁছে দেওয়া এবং পরীক্ষা শেষে আবার নিরাপদে বাড়ি ফিরিয়ে আনার দায়িত্ব পালন করেন। শুধু যাতায়াতই নয়, দূর-দূরান্ত থেকে আসা পরীক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মানসিক চাপ দূর করতে বিনামূল্যে পুষ্টিকর খাবার ও বিশুদ্ধ পানিরও ব্যবস্থা করা হয় এই ক্যাম্পেইন থেকে।
সরেজমিনে দেখা যায়, পুরো পরীক্ষাজুড়ে তীব্র গরম কিংবা বৈরী আবহাওয়া উপেক্ষা করে একঝাঁক তরুণ নিরলসভাবে শ্রম দিয়ে গেছেন। এই মানবিক কাফেলার অগ্রভাগে থেকে মাঠ পর্যায়ে সুশৃঙ্খলভাবে পুরো কার্যক্রমটি সফল করতে মুখ্য ভূমিকা পালন করেন:,,হাসান মুরাদ,ফাহিম সিকদার,হাসানুল করিম, ইদ্রিসসহ স্থানীয় একঝাঁক নিবেদিতপ্রাণ যুবসমাজ।
তাদের সুশৃঙ্খল ও আন্তরিক ব্যবস্থাপনার কারণে কোনো ধরনের ভোগান্তি বা যানজটের জটিলতা ছাড়াই শিক্ষার্থীরা সঠিক সময়ে কেন্দ্রে পৌঁছাতে পেরেছে এবং সম্পূর্ণ দুশ্চিন্তামুক্ত হয়ে পরীক্ষায় অংশ নিতে পেরেছে।
এই মহতী উদ্যোগের মূল পৃষ্ঠপোষক ও প্রবাসী সমাজসেবক জাকারিয়া কবির দূর প্রবাস থেকে এক আবেগঘন অনুভূতি প্রকাশ করে বলেন: ”আমাদের মূল লক্ষ্যই ছিল গ্রামীণ এলাকার শিক্ষার্থীরা যেন যাতায়াত বা অন্য কোনো পারিপার্শ্বিক কারণে মানসিক চাপ বা দুশ্চিন্তায় না ভোগে। তারা যেন হাসিমুখে কেন্দ্রে যেতে পারে এবং পরীক্ষা দিতে পারে। আজ পরীক্ষা সফলভাবে শেষ হওয়ায় এবং সন্তানদের মুখে হাসি দেখে আমি অত্যন্ত আনন্দিত ও আত্মতৃপ্ত। এই সম্মিলিত প্রচেষ্টায় আমরা আমাদের গ্রামকে আরও সুন্দর ও একটি আদর্শ সমাজ হিসেবে গড়ে তুলতে চাই। এই সেবামূলক ধারাবাহিকতা যেন ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে বজায় রাখা যায়, সেজন্য আমি সকলের দোয়া ও সহযোগিতা কামনা করছি।”
আজ শেষ দিনের পরীক্ষা শেষে কেন্দ্র থেকে বেরিয়ে আসার সময় পরীক্ষার্থী এবং তাদের অভিভাবকদের চোখে-মুখে ছিল স্বস্তির ছাপ। কয়েকজন অভিভাবক আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন, “বর্তমান সময়ে যেখানে যাতায়াত খরচ ও অন্যান্য সংকট প্রকট, সেখানে টানা এক মাস আমাদের সন্তানদের যেভাবে ঘরের মানুষের মতো আগলে রেখে পরীক্ষা দেওয়ানো হয়েছে, তা কল্পনাতীত। আমরা সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি আজীবন কৃতজ্ঞ।”
আজ সমাপনী দিনে উপস্থিত স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ, শিক্ষাবিদ ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা এই উদ্যোগের ভূয়সী প্রশংসা করে বলেন— যুগশ্রেষ্ঠ অলি, হুজুর কেবলা আওলাদে রাসুল হযরত শাহসূফী সৈয়দ মুহাম্মদ তৈয়্যব শাহ্ (রহ.) যে দ্বীনি ও মানবিক লক্ষ্য নিয়ে ‘গাউছিয়া কমিটি বাংলাদেশ’ গঠন করেছিলেন, সেই মূল আদর্শকে বুকে ধারণ করেই উত্তর ছনহরার এই যুবসমাজ এগিয়ে চলেছে। এই মানবিক কাফেলা যেন সামনের দিনগুলোতে সমাজের প্রতিটি স্তরে আরও বেগবান, সুদূরপ্রসারী ও কল্যাণকামী ভূমিকা রাখতে পারে, সেই আশাবাদ ব্যক্ত করেন বক্তারা।
উপস্থিত সকলের সর্বসম্মত অভিমত— মানবতার কল্যাণে পটিয়ার উত্তর ছনহরার এই যুবসমাজের এমন উজ্জ্বল ও দূরদর্শী দৃষ্টান্ত আগামী দিনে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের তরুণ ও যুবসমাজের জন্য এক পরম অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।