
এরশাদ আলম লোহাগাড়া (চট্টগ্রাম): চট্টগ্রামের লোহাগাড়ায় ব্যাঙের ছাতার মতো গড়ে উঠেছে বেসরকারি হাসপাতাল এবং ডায়াগনস্টিক সেন্টার। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বেঁধে দেওয়া নিয়মনীতিও পুরোপুরি মানা হচ্ছেনা এসব হাসপাতালে। বড়-বড় ভবন এবং বাইরে ঝিকঝাঁক থাকলেও অনেক হাসপাতালে নেই অভিজ্ঞ নার্স ও ল্যাব টেকনোলজিষ্ট। এছাড়াও কাগজে কলমে ১০ শয্যা হাসপাতালের অনুমোদন থাকলেও বাস্তবে দেখা যায় ২০ শয্যার উপরে। নানা অনিয়মের মাধ্যমে এসব হাসপাতাল চললেও নেই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদারকি।
জানা যায়, সম্প্রতি ১৭ মার্চ সালমা আক্তার নামে ছয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা এক মহিলা চিকিৎসা সেবা নিতে যান উপজেলা সদরের বটতলী স্টেশনের কাঁচা বাজারের সামনে অবস্থিত সাউন্ড হেলথ্ হাসপাতালে। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক বলেন তার রক্তশূন্যতা রয়েছে। পরে ডাক্তারের পরামর্শে একই হাসপাতালে করান হয় রক্ত পরীক্ষা। পরীক্ষার রিপোর্টে আসে এ-বি পজেটিভ। সেই অনুযায়ী রক্তদাতা সংগ্রহ করেন। রক্তের গ্রুপ নিয়ে ছালমার সন্দেহ হলে আরেকটি হাসপাতালে আবারো রক্ত পরীক্ষা করেন। সেই হাসপাতালের রিপোর্টে দেখা যায় এ-বি পজেটিভ নয় বরং ও পজেটিভ।
রবিবার (৫ এপ্রিল) সকালে উপজেলার কর্মরত সংবাদ কর্মীদের ভুল রিপোর্টের বিষয়টি জানান ভুক্তভোগী ছালমা আক্তার ও তার পরিবার।
ছালাম আক্তার সাতকানিয়া উপজেলার গারাঙ্গীয়া এলাকার, আলুর ঘাট, বদিউর রহমান সিকদার (প্রকাশ বদ সিকদার পাড়ার) নজরুল ইসলামের স্ত্রী।
ভুক্তভোগী ছালমা আক্তার জানান, তিনি গর্ভবতী হবার পর থেকেই লোহাগাড়া সাউন্ড হেলথ হাসপাতালের গাইনি চিকিৎসক ডাঃ মিতালি কর্মকার থেকে চিকিৎসা সেবা গ্রহণ করে আসছেন। এরই ধারাবাহিকতায় গত ১৭ মার্চ ডাক্তার দেখাতে গেলে শরীরে রক্ত শুন্যতা রয়েছে এবং শরীরে রক্ত দিতে হবে বলে জানান ডাক্তার মিতালি, রক্তের গ্রুপ নির্ণয় করার জন্যও বলেন। সাথে সাথে সাউন্ড হেলথ হাসপাতালের ল্যাবে রক্তের গ্রুপ নির্ণয় করার জন্য রক্ত দিয়ে অপেক্ষা করেন। পরক্ষণেই সেখানকার ল্যাব টেকনোলজিষ্ট জেহেরান হোসাইন স্বাক্ষরিত “এবি পজেটিভ” (AB/ positive) একটি রিপোর্ট দেন। এই রিপোর্টের উপর ভিত্তি করে লোহাগাড়া রক্তদান গ্রুপের একজন ব্লাড ডোনার সঙ্গে নিয়ে উপজেলার লোহাগাড়া সিটি হাসপাতাল লিঃ এ রক্ত দিতে গেলে সেখানে বাঁধে বিপত্তি। সিটি হাসপাতাল লিঃ এ রিপোর্ট আসে “ও পজেটিভ” । এখানেই শেষ নয়, আরো নিশ্চিত হবার জন্য পার্শ্ববর্তী মা শিশু হাসপাতালেও রক্তের গ্রুপ নির্ণয় করলে, সেখানেও “ও পজেটিভ” সনাক্ত হয়। ২ এপ্রিল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গিয়ে পুনরায় রক্তের গ্রুপ নির্ণয় করলে “ও পজেটিভ” সনাক্ত হয়। তখন শতভাগ নিশ্চিত হলেন লোহাগাড়া সাউন্ড হেলথ হাসপাতালের রিপোর্ট ছিল ভুল। এরকম নামিদামি হাসপাতালে ভুল করলে এর দায়ভার কে নেবে? তিনি সচেতন না হলে তার বড় ধরনের ক্ষতি হয়ে যেতো বলে জানান তিনি। ভুক্তভোগী ছালমা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন।
লোহাগাড়া রক্তদান গ্রুপের মডারেটর মোঃ ইয়াছিন জানান, লোহাগাড়ায় অনেক অসহায় মানুষকে বিভিন্ন গ্রুপের রক্তের ব্যবস্থা করে দিয়েছি কিন্তু এধরনের ভুল অর দেখিনি। ছালমার রিপোর্ট অনুযায়ী “এবি পজেটিভ” ডোনার দিয়েছি । পরে জানলাম ছালমার রক্তের গ্রুপ “ও পজিটিভ”। এধরনের ভুল হলে রোগীর অনেক বড় ধরনের ক্ষতি হয়ে যেতে পারে।
এবিষয়ে জানতে চাইলে লোহাগাড়া সাউন্ড হেলথ হসপিটাল এন্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারের ল্যাব টেকনোলজিষ্ট জেহেরান হোসাইন নিজের ভুল শিকার করে বলেন, আমাদের ল্যাবে যে রি-এজেন্ট দিয়ে বিভিন্ন পরীক্ষা করা হতো সেই রি-এজেন্টের মেয়াদ থাকা সত্ত্বেও কেন ভুল রিপোর্ট আসলো সে বিষয়ে কর্তৃপক্ষ রি-এজেন্ট কোম্পানির সাথে কথা বলবে।
লোহাগাড়া সাউন্ড হেল্থ হসপিটাল এন্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারের ল্যাব ডাইরেক্টর ডাঃ ইশতিয়াকুর রহমান এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কম্পানিকে জানানোর কথা বললেও তিনি নিজেই জানেন না কোন কম্পানির রি-এজেন্টে সমস্যা হয়েছে। এমনকি কখন জানিয়েছেন সেটাও জানেন না তিনি। আরো উঠে আসে একেকজনের কথায় একেকরকম তথ্য। কেউ বলেন এ সমস্যা ১০ থেকে ১৫ দিন ধরে হচ্ছে আবার কেউ বলেন ২ দিন ধরে হচ্ছে।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাঃ মোহাম্মদ ইকবাল জানান, বিষয়টি তিনি অবগত নন,
কেউ লিখিত অভিযোগ করলে অভিযুক্ত হাসপাতালের বিরুদ্ধে তদন্ত সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
চট্টগ্রাম সিভিল সার্জন ডাঃ জাহাঙ্গীর আলমের সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করলে তিনি জানান, এটি খুবই সংবেদনশীল বিষয়। এই ভুলের কারণে রোগীর মৃত্যুও হতে পারে। হাসপাতালটিকে আমরা শোকজ করব প্রথমে, এরপর ল্যাব টেকনলজিষ্ট যিনি ছিলেন উনি ডিগ্রীধারী কিনা সেটাও খতিয়ে দেখব এবং তদন্ত সাপেক্ষে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।