
হাফিজুর রহমান খান,স্টাফ রিপোর্টার (কক্সবাজার) কক্সবাজারের সাগরের সেন্টমার্টিন পয়েন্ট এলাকায় নৌবাহিনীর অভিযানে অবৈধভাবে মালয়েশিয়া যাওয়ার চেষ্টাকালে ২৭৩ জন নারী ও পুরুষ আটক হওয়ার ঘটনায় নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে—এত বিপুল সংখ্যক মানুষ কীভাবে দীর্ঘদিন নজরের বাইরে থেকে পাচারের প্রস্তুতি নিচ্ছিল গোপন নেটওয়ার্ক ও দালালচক্র:নৌবাহিনী সূত্র জানায়, আটক ব্যক্তিরা সবাই সমুদ্রপথে মালয়েশিয়া যাওয়ার উদ্দেশ্যে একাধিক দালালের মাধ্যমে জড়ো হয়েছিলেন। প্রত্যেকের কাছ থেকে জনপ্রতি ৩ থেকে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত নেওয়ার চুক্তি হয়েছিল বলে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তথ্য মিলেছে। এই অর্থ স্থানীয় দালাল, নৌযান মালিক ও বিদেশে অবস্থানরত সিন্ডিকেটের মধ্যে ভাগ হয়ে থাকে বলে অভিযোগ রয়েছে।
বিশ্বস্ত সূত্রে জানা গেছে, কক্সবাজার, টেকনাফ, উখিয়া ও পার্শ্ববর্তী কয়েকটি জেলার গ্রামভিত্তিক দালালরা দীর্ঘদিন ধরে এই পাচার কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। স্থানীয় পর্যায়ের এই দালালদের সঙ্গে প্রভাবশালী চক্রের যোগাযোগ রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে।
ঝুঁকিপূর্ণ সমুদ্রযাত্রা ও মানবিক বিপর্যয়:বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সেন্টমার্টিন পয়েন্ট ব্যবহার করে পাচার নতুন নয়। অতীতে এই রুটে বহুবার নৌডুবি, নিখোঁজ ও মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। তারপরও দালালদের প্রলোভনে পড়ে দরিদ্র ও বেকার মানুষ জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সমুদ্রে পাড়ি জমাচ্ছেন।
আটক কয়েকজন জানান, মালয়েশিয়ায় পৌঁছালে ভালো চাকরি ও উচ্চ আয়ের স্বপ্ন দেখানো হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে তারা জানতেন না নৌযানের সক্ষমতা, খাবার-পানি কিংবা নিরাপত্তা ব্যবস্থা সম্পর্কে।আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ঘটনায় শুধু যাত্রীরা নয়, মূল অপরাধী হলো সংগঠিত মানব পাচারকারী চক্র।
মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন, ২০১২ অনুযায়ী—ধারা ৬: মানব পাচারের অপরাধে সর্বোচ্চ যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড।ধারা ৭: পাচারে সহায়তা বা ষড়যন্ত্রের জন্য একই ধরনের শাস্তির বিধান।ধারা ১২: পাচারের শিকার ব্যক্তিদের ভুক্তভোগী হিসেবে চিহ্নিত করে পুনর্বাসনের নির্দেশনা।অন্যদিকে, অবৈধভাবে বিদেশে গমনের প্রস্তুতির দায়ে পাসপোর্ট আদেশ, ১৯৭৩ অনুযায়ীও মামলা দায়েরের সুযোগ রয়েছে। তবে মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, যাত্রীদের অপরাধী নয়—ভুক্তভোগী হিসেবে দেখাই উচিত।স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরেই নির্দিষ্ট কয়েকটি পয়েন্ট থেকে রাতের আঁধারে লোক জড়ো করা হয়। তাহলে এত বড় আয়োজন প্রশাসনের নজরে আসেনি কীভাবে? পাচার চক্রের সঙ্গে স্থানীয় প্রভাবশালী বা অসাধু নৌযান মালিকদের সংশ্লিষ্টতা আছে কি না—সেটিও তদন্তের দাবি রাখে।নৌবাহিনী জানিয়েছে, আটক ব্যক্তিদের প্রয়োজনীয় জিজ্ঞাসাবাদ শেষে জেলা প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে এবং দালালচক্র শনাক্তে গোয়েন্দা কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, শুধু অভিযান নয়—পাচার রুটের স্থায়ী নজরদারি, দালালদের আর্থিক লেনদেন তদন্ত, এবং পাচার-প্রবণ এলাকায় সচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদার না হলে এই মানব পাচার বন্ধ করা সম্ভব নয়।