নিজস্ব প্রতিবেদকঃ দক্ষিণ চট্টগ্রামের বাঁশখালীর ক্রীড়াঙ্গনে এক পরিচিত, সংগ্রামী ও অনুপ্রেরণার নাম মোহাম্মদ এরশাদ। ক্রিকেটকে ভালোবেসে যিনি নিজেকে গড়ে তুলেছেন একজন দক্ষ ক্রিকেটার, সফল প্রশিক্ষক, ক্রীড়া সংগঠক, তথ্য অনুসন্ধানী এবং নারী ফুটবলের অন্যতম পথিকৃৎ হিসেবে। জীবনের কঠিন বাস্তবতা, দারিদ্র্য আর সীমাহীন সংগ্রামকে জয় করে তিনি আজ হয়ে উঠেছেন বাঁশখালীর ক্রীড়াঙ্গনের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র।
শৈশব থেকেই খেলাধুলার প্রতি ছিল তার প্রবল আকর্ষণ। অল্প বয়সে ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী মো. শহীদুল্লাহ টুটুলের সহযোগিতায় ক্রিকেটে তার পথচলা শুরু হয়। বাঁশখালীর বিভিন্ন মাঠে দুর্দান্ত ব্যাটিং ও অলরাউন্ড পারফরম্যান্সের মাধ্যমে খুব দ্রুতই দর্শকদের নজর কাড়েন তিনি। বিশেষ করে তার সেঞ্চুরির ইনিংস দেখতে মাঠে দর্শকদের উপচে পড়া ভিড় জমত। একের পর এক চ্যাম্পিয়ন ট্রফি ও সেরা খেলোয়াড়ের পুরস্কার জয় করে তিনি হয়ে ওঠেন উপজেলার ক্রীড়াঙ্গনের উজ্জ্বল মুখ।
তবে এই পথচলা মোটেও সহজ ছিল না। অত্যন্ত দরিদ্র পরিবারে চার ভাইয়ের মধ্যে সবার ছোট ছিলেন এরশাদ। ছোটবেলাতেই হারান বাবাকে। পিতৃহীন জীবনে দারিদ্র্য আর সংগ্রাম ছিল তার নিত্যসঙ্গী। অর্থের অভাবে পড়ালেখার পথও হয়ে উঠেছিল কঠিন। যাতায়াত সমস্যার কারণে কালীপুর এজহারুল হক উচ্চ বিদ্যালয় থেকে কোকদন্ডী গুনাগরী উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হতে হয়েছিল তাকে। ভাইয়েরা আলাদা সংসার নিয়ে ব্যস্ত থাকায় তেমন সহযোগিতা করতে পারেননি। জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিলেন তার মমতাময়ী মা। মায়ের সীমিত সামর্থ্য ও ভালোবাসাকে পুঁজি করেই তিনি এগিয়ে গেছেন জীবনের কঠিন পথে।
ধারাবাহিক ভালো পারফরম্যান্সের সুবাদে তিনি সুযোগ পান চট্টগ্রাম রেঞ্জ পুলিশ টি-২০ ক্রিকেট টুর্নামেন্টে কয়ডিয়াল ক্রিকেট একাডেমির হয়ে খেলার। চট্টগ্রাম শহরের ছোটপুল পুলিশ লাইন মাঠে জীবনের প্রথম ম্যাচেই ব্যাটিং ও বোলিং—উভয় বিভাগে অসাধারণ নৈপুণ্য দেখিয়ে ‘ম্যান অব দ্য ম্যাচ’ নির্বাচিত হন তিনি। যদিও দল জয় পায়নি, তবে তার পারফরম্যান্স সবার নজর কাড়ে।
পরবর্তীতে তার দুর্দান্ত নৈপুণ্য নজরে আসে সাবেক জাতীয় ক্রিকেটার মাসুম উদ দৌলা মাসুমের। পরে নিউ ক্রিকেট একাডেমির কোচ আবু সামা বিপ্লব ও মাসুমের হাত ধরে তিনি সুযোগ পান ঐতিহ্যবাহী মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের হয়ে প্রথম বিভাগ ক্রিকেট লীগে খেলার। দীর্ঘদিন ধরে তিনি চট্টগ্রামের স্বনামধন্য মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব ব্লুজ, মাদারবাড়ী মুক্তকণ্ঠ ক্লাব, নিমতলা লাইন্স ক্লাবসহ বিভিন্ন দলে সফলতার সঙ্গে খেলেছেন।
নিজের ক্যারিয়ার গড়ার পাশাপাশি এলাকার তরুণদের জন্য কিছু করার স্বপ্ন থেকেই ২০১১ সালে স্থানীয় খেলোয়াড়দের সহযোগিতায় তিনি প্রতিষ্ঠা করেন “বাঁশখালী ক্রিকেট একাডেমি”। বর্তমানে তার একাডেমি থেকে উঠে আসা অসংখ্য খেলোয়াড় চট্টগ্রাম প্রিমিয়ার ডিভিশন, প্রথম বিভাগ, দ্বিতীয় বিভাগ ও তৃতীয় বিভাগ ক্রিকেট লীগে খেলছেন। দেশের স্বনামধন্য ক্লাব আবাহনী লিমিটেডসহ বিভিন্ন দলে জায়গা করে নিয়েছেন তার একাডেমির খেলোয়াড়রা। প্রতি বছর প্রায় ৩৫ জন খেলোয়াড় বিভিন্ন পর্যায়ে সুযোগ পাচ্ছেন। শুধু দেশেই নয়, ভারত ও মালয়েশিয়ার মতো দেশেও আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে অংশ নিচ্ছেন তার গড়া ক্রিকেটাররা।
২০১৯ সালে কক্সবাজার আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে বাংলাদেশ নারী অনূর্ধ্ব-১৯ ক্রিকেট দলের প্রস্তুতিমূলক প্রীতি সিরিজে অংশ নিয়ে চমক দেখায় বাঁশখালী ক্রিকেট একাডেমি। প্রথম সিরিজে বাংলাদেশ নারী অনূর্ধ্ব-১৯ দলকে ২-১ ব্যবধানে হারিয়ে আলোচনায় আসে একাডেমিটি। দ্বিতীয় সিরিজ ১-১ ব্যবধানে ড্র হয়। এই অর্জন একাডেমির ইতিহাসে গর্বের এক অধ্যায় হয়ে আছে।
ক্রিকেটের পাশাপাশি দক্ষিণ চট্টগ্রামে নারী ক্রীড়ার বিকাশেও রেখেছেন অসামান্য অবদান। ২০১৮ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন মহিলা ফুটবল একাডেমি। তার একাডেমির মেয়েরা ঢাকা প্রিমিয়ার প্রমীলা ফুটবল লীগ, বিকেএসপি এবং বিভিন্ন জাতীয় বয়সভিত্তিক টুর্নামেন্টে অংশ নেওয়ার সুযোগ পেয়েছে। বঙ্গমাতা অনূর্ধ্ব-১৭ জাতীয় ফুটবল টুর্নামেন্টে তার একাডেমির খেলোয়াড়দের সমন্বয়ে গঠিত আনোয়ারা উপজেলা দল চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করে। একই সঙ্গে বাঁশখালী মহিলা ফুটবল একাডেমির খেলোয়াড়দের নিয়ে গঠিত দল ইতিহাসে প্রথমবার দক্ষিণ জোনের ফাইনালে খেলার যোগ্যতা অর্জন করে।
সম্প্রতি “নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস-২০২৬” বালক ক্রিকেট টুর্নামেন্টে বাঁশখালী উপজেলা দলের প্রধান কোচ হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আবারও নিজের নেতৃত্বগুণের প্রমাণ দিয়েছেন তিনি। তার কোচিংয়ে বাঁশখালী উপজেলা বালক ক্রিকেট দল চট্টগ্রাম জেলা চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করে।
ক্রীড়াঙ্গনের পাশাপাশি সাংবাদিকতাতেও নিজের দক্ষতার পরিচয় দিয়ে যাচ্ছেন মোহাম্মদ এরশাদ। তিনি দৈনিক আজাদী, চ্যানেল এস এবং দৈনিক জনবানীতে বাঁশখালী প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
মোহাম্মদ এরশাদ বলেন, “খেলাধুলা শুধু জয়-পরাজয়ের বিষয় নয়, এটি শৃঙ্খলা, আত্মবিশ্বাস ও ভবিষ্যৎ গড়ার সবচেয়ে বড় মাধ্যম। ক্রিকেট আমার কাছে শুধু খেলা নয়, এটা আমার জীবন ও বিশ্বাস।”
আজ মোহাম্মদ এরশাদ শুধুমাত্র একজন ক্রীড়া ব্যক্তিত্ব নন, তিনি বাঁশখালীর ক্রীড়াঙ্গনের এক জীবন্ত অনুপ্রেরণা—যার হাত ধরে নতুন প্রজন্ম ছুঁয়ে যাচ্ছে সাফল্যের নতুন দিগন্ত।